মানুষের চরিত্রের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ব্যাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অহংকার (Arrogance) বা অহমিকা (Egotism)। এটি এমন এক আত্মঘাতী প্রবণতা, যা মানুষের ঈমান ও আমলকে নিমিষেই ধ্বংস করে দেয়। ইসলামে অহংকার করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি একটি কবিরা গুনাহ। শয়তান বা ইবলিস আজাজিল থেকে বিতাড়িত শয়তানে পরিণত হয়েছিল শুধুমাত্র এই অহংকারের কারণেই। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব অহংকার কী, এর ভয়াবহতা এবং এর থেকে বেঁচে থাকার উপায় সম্পর্কে।
অহংকার ও অহমিকা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। জানুন অহংকারের ভয়াবহতা, কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং অহংকার থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে। পড়ুন বিস্তারিত।
অহংকার বা কিবর (Kibr) কী?
সহজ কথায়, নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় বা শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করাই হলো অহংকার। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) অহংকারের সংজ্ঞায় বলেছেন:
“অহংকার হলো সত্যকে দম্ভের সাথে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ মনে করা।” (সহিহ মুসলিম: ৯১)
ইসলামে আত্মমর্যাদাবোধ (Self-respect) থাকা ভালো, কিন্তু যখনই তা ‘আমিই শ্রেষ্ঠ’ বা ‘ও আমার চেয়ে অধম’—এই চিন্তায় রূপ নেয়, তখনই তা হারাম অহংকারে পরিণত হয়।
অহংকারের আদি ইতিহাস: শয়তানের পতন
পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম পাপটি ছিল অহংকার। আল্লাহ যখন আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করে ফেরেশতাদের সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, তখন সবাই সিজদা করলেও ইবলিস অস্বীকার করল। সে যুক্তি দিল:
“আমি তার (আদমের) চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারা।” (সূরা আরাফ: ১২)
এই অহমিকার কারণেই আল্লাহ তাকে জান্নাত থেকে চিরতরে বিতাড়িত এবং অভিশপ্ত ঘোষণা করলেন। সুতরাং, যে ব্যক্তি অহংকার করে, সে মূলত শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে অহংকারের ভয়াবহতা
১. জান্নাতে প্রবেশে বাধা:
অহংকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন:
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ মুসলিম)
২. আল্লাহর চাদর নিয়ে টানাটানি:
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“অহংকার আমার চাদর এবং মহত্ত্ব আমার লুঙ্গি। যে ব্যক্তি এর কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে টানাটানি (দাবি) করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সুনানে আবু দাউদ)
৩. আল্লাহ অহংকারীকে পছন্দ করেন না:
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” (সূরা লোকমান: ১৮)
অহংকারের লক্ষণসমূহ
আমাদের মধ্যে অহংকার আছে কি না, তা বোঝার কিছু লক্ষণ রয়েছে:
অন্যের মতামতকে গ্রাহ্য না করা বা তাচ্ছিল্য করা।
নিজের ভুল স্বীকার না করা।
মানুষের সাথে কথা বলার সময় মুখ ফিরিয়ে রাখা বা অবজ্ঞা করা।
নিজের বংশ, সম্পদ, রূপ বা জ্ঞান নিয়ে বড়াই করা।
দরিদ্র বা অধস্তনদের সাথে খারাপ আচরণ করা।
অহংকারের পরিণাম (দুনিয়া ও আখিরাত)
দুনিয়াতে: মানুষ অহংকারী ব্যক্তিকে ঘৃণা করে। সাময়িকভাবে কেউ ভয়ে সম্মান দেখালেও অন্তরে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না। আল্লাহ তাদের লাঞ্ছিত করেন।
আখিরাতে: কিয়ামতের দিন অহংকারীদের পিপীলিকার মতো ক্ষুদ্র আকৃতিতে উঠানো হবে এবং মানুষ তাদের পা দিয়ে মাড়াবে। (তিরমিজি)
অহংকার থেকে বাঁচার উপায় (আত্মশুদ্ধি)
১. নিজের সৃষ্টির দিকে তাকানো: মানুষের সৃষ্টি এক ফোঁটা নাপাক পানি থেকে। যার শুরু নাপাক পানি আর শেষ পচা লাশ, তার অহংকার সাজে না।
২. বিনয় অবলম্বন করা: রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।”
৩. সালামের প্রসার: আগে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করলে মনের অহংকার দূর হয়।
৪. সাধারণ জীবনযাপন: নিজের কাজ নিজে করা এবং সাধারণ পোশাক ও জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া।
৫. আল্লাহর বড়ত্ব স্মরণ করা: সব ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব একমাত্র আল্লাহর—এই কথা সর্বদা মনে রাখা।
অহংকার ও অহমিকা
ইসলামে অহংকারের শাস্তি
অহংকার পতনের মূল
কিবর বা অহংকার
শয়তানের অহংকার
আত্মশুদ্ধি ও বিনয়
কবিরা গুনাহ
Islamic Teachings on Pride
Arrogance in Islam
#Islamic_Academy_NP
উপসংহার
অহংকার বা অহমিকা এমন এক আগুন, যা মানুষের নেক আমলগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আসুন, আমরা শয়তানি এই স্বভাব বর্জন করি এবং বিনয়ী হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করি। আল্লাহ আমাদের অন্তরকে অহংকারমুক্ত রাখুন। আমিন।
#ইসলামিক_একাডেমি_এনপি #হে_মুমিনগণ! #ইবনে_মাজাহ #হাদীস_বিশ্ব_নবীর_বাণী #সুনানে_ইবনে_মাজাহ #রিয়াদুস_সালেহীন #মুহাম্মদের_বাণী
0 Comments