দোয়া মুমিনের অন্যতম হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বান্দা মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তবে অনেক সময় আমাদের দোয়া কবুল হয় না। এর পেছনে কিছু কারণ থাকতে পারে। কোরআন ও হাদিসে দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত ও آداب (শিষ্টাচার) বর্ণনা করা হয়েছে। সেগুলো অনুসরণ করলে আশা করা যায় আল্লাহ আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন।
কোরআনের আলোকে দোয়া কবুল;
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা কবুল করার ওয়াদা করেছেন।
আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা: দোয়া কবুলের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহর কাছেই চাওয়া। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।" (সূরা গাফির, আয়াত: ১৪)
আল্লাহর কাছে চাওয়া: আল্লাহ চান বান্দা তার কাছে দোয়া করুক। তিনি বলেন, "আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সূরা গাফির, আয়াত: ৬০)
আল্লাহর নৈকট্য: আল্লাহ তার বান্দার খুব কাছে আছেন এবং তিনি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, "আর আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন আপনি বলে দিন, নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী। দোয়াকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই।" (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
হাদিসের আলোকে দোয়া কবুল;
রাসূলুল্লাহ (সা.) তার বিভিন্ন হাদিসে দোয়া কবুল হওয়ার উপায় ও শর্তাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
দোয়া কবুলের শর্ত ও আদব:
হারাম থেকে বেঁচে থাকা: দোয়া কবুল হওয়ার জন্য হারাম খাদ্য, পানীয় ও উপার্জন থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। রাসূল (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন যার সফরের চুলগুলো এলোমেলো এবং শরীর ধুলোমলিন, সে আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করে, কিন্তু তার খাবার, পানীয় ও পোশাক হারাম হওয়ায় তার দোয়া কবুল হয় না।
তাড়াহুড়া না করা: দোয়া করে কবুল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। রাসূল (সা.) বলেছেন, "তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যদি সে তাড়াহুড়া না করে।" (বুখারি: ৬৩৪০)
আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পাঠ: দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূল (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা উচিত।
পূর্ণ মনোযোগ ও বিশ্বাস: পূর্ণ মনোযোগ ও দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে দোয়া করতে হবে যে আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন। অবচেতন মনের দোয়া আল্লাহ গ্রহণ করেন না।
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করা: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর দোয়া কবুল হয় না।
পাপ কাজের জন্য দোয়া না করা: কোনো পাপ কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করা যাবে না।
যেসব ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়:
হাদিসে এমন কিছু ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে যাদের দোয়া আল্লাহ তায়ালা ফিরিয়ে দেন না:
মজলুমের দোয়া: অত্যাচারিত ব্যক্তির দোয়া আল্লাহর কাছে সরাসরি পৌঁছে যায়।
পিতা-মাতার দোয়া: সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া কবুল হয়।
মুসাফিরের দোয়া: সফররত ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়।
রোজাদারের দোয়া: ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া: অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতো।
অন্যের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া: কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে ফেরেশতারা ‘আমিন’ বলেন।
দোয়া কবুলের বিশেষ সময়:
কিছু বিশেষ সময়ে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে:
রাতের শেষ তৃতীয়াংশ: আল্লাহ তায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দার দোয়া কবুল করেন।
আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়: এই সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
সিজদার সময়: সিজদারত অবস্থায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে নিকটবর্তী থাকে।
ফরজ নামাজের পর: ফরজ নামাজের পর দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
জুমার দিন: জুমার দিনে একটি বিশেষ মুহূর্ত রয়েছে যখন দোয়া কবুল হয়।
বৃষ্টির সময়: বৃষ্টি বর্ষণের সময় দোয়া কবুল হয়।
দোয়া কবুলের জন্য কিছু নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে। একনিষ্ঠভাবে আপনার কাছে দোয়া করা, দোয়া করা শুরুতে ও দরুদ শরীফ পাঠ করা, কেয়ামতের আগে দোয়া করা, হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করা এবং দোয়া করার সময় একাগ্রতা এবং দোয়া কবুলের জন্য সহায়ক।
দোয়া কবুল সংখ্যা কিছু উপায় উল্লেখ করা হলো;
একনিষ্ঠভাবে দোয়া করা:
শুধুমাত্র নিশ্চিত সন্তুষ্টির জন্য প্রার্থনা করা উচিত, পার্থিব কোনো স্বার্থের জন্য নয়।
দোয়ার শুরুতে ও দরূদ শরীফ করা:
দরূদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে দোয়া আরও বেশি ফলপ্রসূ হয়।
দোয়ার সময় একা গ্রাস করা:
দোয়া করার সময় অন্যের দিকে কোন কিছু না জানার জন্য অনুরোধ করা উচিত।
হালাল রিজিকার ব্যবস্থা করা:
হালাল খাবার গ্রহণ করা এবং হারাম থেকে রাখার চেষ্টা করা কবুলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গুনাহ থেকে স্থায়ী:
বেশি বেশি গুণাহ দোয়া কবুল হতে হয়।
দোয়া করার সময় ও স্থান নির্বাচন:
কিছু সময় ও স্থান প্রার্থনা কবুলের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত, যেমন- আনন্দের সময়, আজান পর, নামাজের পর, শবে কদরের রাত ইত্যাদি।
প্রশংসা করা:
প্রার্থনা শুরু করতে ও বিজয়ের প্রশংসা করা এবং তাঁর গুণবাচক নাম জিকির করা উচিত।
ইসমে আজম ব্যবহার করা:
ইসমে আজম (আল্লাহ মহান নাম) ব্যবহার করে দোয়া করতে তাকবুল কবুল পাস বাড়ে।
ধৈর্য:
দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়া না করে ধৈর্য্য করা উচিত।
বিনয়ী:
দোয়া করার সময় বিনয়ী ও নম্রভাইটি উচিত।
অন্যের জন্য দোয়া করা:
অন্যের জন্য দোয়া করুন নিজের জন্য দোয়া কবুল সামনে এগিয়ে যান।
গুনাহ থেকে তাওবা করা:
গুনাহ কার্যকর হয়ে দ্রুত তাওবা করা উচিত।
সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করা:
সমাজে সৎ সংবাদ আদেশ ও অসৎ সংবাদ নিষেধে প্রার্থনা কবুলের পায়ে বাড়ে।
দোয়ায় প্রকাশনি প্রকাশ করা:
দোয়া করার সময় নিজের শাহানি ও অভাব-অনটনের কাছে জানা উচিত।
অযুর সাথে দোয়া করা:
আজু করে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা উত্তম।
স্বাভাবিক নিয়ম চালু করলে আশা করা যায় কবুল করা হবে।
উপসংহার:
দোয়া একটি শক্তিশালী ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। দোয়া কবুলের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করা এবং তার কাছেই সাহায্য চাওয়া উচিত। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত শর্ত ও আদব মেনে দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই আমাদের ডাকে সাড়া দেবেন। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তিনভাবে দোয়া কবুল করেন: হয়তো যা চাওয়া হয়েছে তাই দেন, অথবা তার প্রতিদান পরকালের জন্য জমা রাখেন, নতুবা তার থেকে কোনো অমঙ্গল দূর করে দেন। তাই কোনো অবস্থাতেই দোয়া করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
#ইসলামিক_একাডেমি_এনপি #হে_মুমিনগণ! #ইবনে_মাজাহ #হাদীস_বিশ্ব_নবীর_বাণী #সুনানে_ইবনে_মাজাহ #রিয়াদুস_সালেহীন #মুহাম্মদের_বাণী


0 Comments