কিসাসের আইন মেনে চলো
হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য নরহত্যার ব্যাপারে কিসাস এর আইন লিখে দেয়া হয়েছে। মুক্ত স্বাধীন ব্যক্তি হত্যাকারী হলে তাকে হত্যা করেই কিসাস নেয়া হবে। ক্রীতদাস হত্যাকারী হলে তাকে হত্যা করেই কিসাস নেয়া হবে। কোন নারী হত্যাকারীনি হলে তাকে হত্যা করেই কিসাস নেয়া হবে। অবশ্য কোন অপরাধীর প্রতি তার ভাই যদি কিছুটা নম্র ব্যবহার করতে প্রস্তুত হয় তবে প্রচলিত ন্যায় নীতি অনুযায়ী রক্তপাতের বিনিময় আদায় করা হত্যাকারীর অবশ্য কর্তব্য। ইহা তোমাদের রবের নিকট হতে দহ্রাস ও অনুগ্রহ মাত্র। তারপরেও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে তারজন্য কঠিন পীড়াদায়ক শাস্তি নির্দিষ্ট রয়েছে।
{সূরা বাকারা ২ আয়াত-১৭৮} আরবি বাঃলা উচ্চারণঃ
ইয়া--আইয়্যুহালল্লাযীনা আ-মানূ কূতিবা আলাইকুমুল ক্কিছোয়া-ছু ফিল্ ক্কাত্লা; আল্ হুররু বিলহুররি অল্’আব্’দু বিল্’আব্’দি অল্ উন্ছা-বিল্উন্ছা-; ফামান্’উফিয়া লাহূ মিন্ আখীহি শাইয়ুন্ ফাত্তিবা-’উম্ বিল্’মা’রুফি ‘অআদা—-উন্ ইলাইহি্ বিইহ্সা-ন্; যা-লিকা তাখ্ফীফূম্ মির্ রাব্বিকুম আরাহ্’মাহ্; ফামানি’তাদ- বা’দা যা-লিকা ফালাহ্ ‘আযা-বুন্ আলীম্।
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلۡقِصَاصُ فِي ٱلۡقَتۡلَىۖ ٱلۡحُرُّ بِٱلۡحُرِّ وَٱلۡعَبۡدُ بِٱلۡعَبۡدِ وَٱلۡأُنثَىٰ بِٱلۡأُنثَىٰۚ فَمَنۡ عُفِيَ لَهُۥ مِنۡ أَخِيهِ شَيۡءٞ فَٱتِّبَاعُۢ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَأَدَآءٌ إِلَيۡهِ بِإِحۡسَٰنٖۗ ذَٰلِكَ تَخۡفِيفٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَرَحۡمَةٞۗ فَمَنِ ٱعۡتَدَىٰ بَعۡدَ ذَٰلِكَ فَلَهُۥ عَذَابٌ أَلِيمٞ
* কিসাসুন -এর শাব্দিক অর্থ সমপরিমাণ বা অনুরূপ অর্থাৎ অন্যের প্রতি যতটুকু জুলুম করা হয়েছে তার সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা তার পক্ষে জায়েয।
অর্থাৎ রক্তপাতের প্রতিশোধ গ্রহণে হত্যাকারীর সাথে যেরূপ ব্যবহার করা হয়েছে সেরূপ সে নিহত ব্যক্তির সাথে করেছে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, যেভাবে ও যে পন্থায় নিহত ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে ঠিক সেভাবে ও সে পন্থায় তাকে হত্যা করতে হবে।
বরং এর অর্থ এই যে নিহত ব্যক্তির প্রাণ সংহারের যে কাজ হত্যাকারী করেছে তার সাথেও সেই কাজটি করতে হবে অর্থাৎ তাকে হত্যা করতে হবে ।
জাহিলিয়াতের যুগে একজাতি বা গোত্রের লোকেরা তাদের নিহত ব্যক্তির প্রাণকে যতবেশী মূল্যবান মনে করত হত্যাকারী ব্যক্তির পরিবার গোত্র বা জাতির মধ্য হতে অনুরূপ মূল্যের কোন ব্যক্তির প্রাণ সংহার করে প্রতিশোধ নিতে চাইত।
একপক্ষের কোন সম্মানিত ব্যক্তি যদি প্রতিপক্ষের কোন নগণ্য ব্যক্তি কর্তৃক নিহত হত তবে প্রথম পক্ষের লোকেরা শুধু হত্যাকারীর প্রাণ সংহারকেই যথেষ্ট মনে করতনা।
বরং তারা হত্যাকারীর পরিবার হতে অনুরূপ কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে হত্য করতে চাইত কিংবা এক ব্যক্তির বিনিময়ে প্রতিপক্ষের শত শত ব্যক্তিকে হত্যা করতে চাইত ৷
পক্ষান্তরে নিহত ব্যক্তি যদি তাদের দৃষ্টিতে নিম্নশ্রেণীর হত এবং তার হত্যাকারী খুব সম্মানিত হত তবে নিহত ব্যক্তির প্রাণের বিনিময়ে এই সম্মানিত ব্যক্তির প্রাণ সংহার করা তারা সমীচিন মনে করতনা। এরূপ অবস্থা শুধু তৎকালীন জাহিলী যুগে সীমাবদ্ধ ছিলনা। নিকট অতীত এমনকি সমকালীন বিশ্ব এবং আমাদের সমাজেও এধরনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহপাক এসব অন্যায় ও অমানুষিক রীতিনীতি ও দোষত্রুটির পথ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন নিহত ব্যক্তির হত্যার বিনিময়ে হত্যাকারীর এবং শুধু হত্যাকারীরই প্রাণ সংহার করা যেতে পারে। হত্যাকারী কে বা নিহত ব্যক্তি কে এব্যাপারে তা আদৌ কোন বিবেচ্য বিষয় নয়।
পরবর্তীতে এই আয়াতে ভাই শব্দের উল্লেখ দ্বারা অত্যন্ত, সুক্ষ্ম পন্থায় উদারতা প্রদর্শনের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ তোমার ও অপর ব্যক্তির মধ্যে পিতৃহত্যার শত্রুতা থাকলেও সে ব্যক্তিতো তোমার মানবীয় ভাই । কাজেই তোমারই এক অপরাধী ভায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের ক্রোধ যদি দমন কর তবে মানবতার দিক দিয়ে ইহা যথোচিত কাজ হবে। এই আয়াত হতে এটাও জানা গেল যে ইসলামী দন্ডবিধিতে নরহত্যার দন্ড পর্যন্ত উভয়পক্ষের মর্জীর উপর নির্ভরশীল। এবং হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দেয়ার অধিকার নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর রয়েছে। অবশ্য আয়াতের নির্দেশনানুযায়ী হত্যাকারীকে ক্ষমা করা হলেও দন্ডের বিনিময়ে রক্তমূল্য বা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে। অতঃপর বলা হয়েছে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা রক্ত বিনিময় গ্রহণ করার পরও যদি প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করে কিংবা হত্যাকারী বিনিময় প্রদানে টালবাহানা করে এবং নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীর নম্র ব্যবহারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন না করে তবে তাহা বাড়াবাড়ি বা সীমালংঘন হবে। এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে।
শানেনুযূল : আয়াত - ১৭৮:
ইসলাম-এর আবির্ভাবের কিছু দিন পূর্বে আরবের দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বিজয়ী সম্প্রদায় বিজেতা সম্প্রদায়ের অনেক দাসদাসী ও নারীদের হত্যা করে। রাসুলুল্লাহ (ছঃ) রসূল হিসাবে প্রেরিত হলেন, তারা মুসলমান হয়ে গেল; কিন্তু পূর্ববর্তী যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণের মনোভাবের কোন পরিবর্তন ইসলাম গ্রহণের কারণে আসেনি, অধিকন্ত | বিজেতা গোত্রটি একটি সম্মানিত উচ্চ নামী বংশের মধ্যে পরিগণিত হত। তাই তারা তাদের উপর বিজয়ী গোত্রকে বলল যে, আমরা আমাদের এক গোলামের পরিবর্তে তোমাদের একটি আজাদ ব্যক্তিকে এবং আমাদের একজন নারীর পরিবর্তে তোমাদের একজন পুরুষকে হত্যা করব। তখন অত্র আয়াত অবতীর্ণ হয়।

0 Comments