মা-নুষ সামাজিক জীব। এজন্য আমাদের দৈনন্দিন হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সবার সাথে ভাগাভাগি করেই আমরা বেঁচে থাকি। মানুষ একে অপরের কল্যাণকামী হবে-এটাই স্বাভাবিক। তবে সবসময় তা দেখা যায় না। এই সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশের পেছনে কিছু নীরব ফিতনা চলে। যেমন: হিংসা, নজর, জাদু ইত্যাদি।
এগুলো সর্বকালেই কমবেশি ছিল। তবে সময়ের এই ক্রান্তিলগ্নে প্রতিটি ফিতনা যেমন মরণকামড় বসাচ্ছে, তেমনি এই ফিতনাগুলোও মহামারির আকার ধারণ করেছে।
আমরা 'বদনজর' থেকে আমাদের আলোচনায় প্রবেশ করতে পারি।
এখানে প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বদনজর, জাদু, আসর-এসবের অস্তিত্ব অনেকে বিশ্বাসই করতে চায় না। কেউ বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে, আবার কেউ এসব স্রেফ কুসংস্কার মনে করে উড়িয়ে দেন। যারা ইসলামে বিশ্বাস করেন না, বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে এসব অস্বীকার করেন, তারা আমাদের আলোচনার পাত্র নয়। আমাদের আলোচনার পাত্র হচ্ছেন ঈমানদার ভাই এবং বোনেরা, যারা এ ব্যাপারে সন্দিহান কিংবা এটাকে কুসংস্কার মনে করেন। অতএব আমরা প্রথমে কুরআন-হাদীস থেকে 'বদনজর' সম্পর্কে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা জানব।
বদনজরের প্রামাণিকতা-কুরআন থেকে
১। ইউসুফ আ.-এর ভাইদের ঘটনা-
وَقَالَ يُبَنِيَّ لَا تَدْخُلُوا مِنْ بَابٍ وَاحِدٍ وَادْخُلُوا مِنْ أَبْوَابٍ مُّتَفَرِّقَةٍ وَمَا أُغْنِي الْحُكْمُ لَهِ إلهِ إلهِ تَوَكَّلْتُ وَعَلَيْهِ فَلْيَتَوَكَّلِ عَنْكُمْ مِّنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ إِنِ الْحُكْ
الْمُتَوَكَّلُونَ ) وَلَمَّا دَخَلُوْا مِنْ حَيْثُ أَمَرَهُمْ أَبُوهُمْ مَا كَانَ يُغْنِي عَنْهُمْ مِّنَ اللَّهِ مِنْهُمِ إِنْهُمْ مِّنَ اللَّهِ مِنْ شَيْةِ مِن شَيْةً نَفْسٍ يَعْقُوْبَ قَضُهَا وَإِنَّهُ لَذُو عِلْمٍ لِمَا عَلَّمْتُهُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ)
"ইয়াকুব আ. বললেন, হে আমার সন্তানেরা, (শহরে প্রবেশের সময়) তোমরা সবাই এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না; বরং তোমরা পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর কোনো বিধান থেকে আমি তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারি না। বিধান তো কেবল আল্লাহরই চলে। তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি, আর ভরসাকারীদের তাঁর ওপরই ভরসা করা উচিত। তারা যখন বাবার কথামতো প্রবেশ করল, আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে সেটা তাদের বাঁচাতে পারল না। কিন্তু ইয়াকুবের সিদ্ধান্তে তাঁর মনের একটি বাসনা ছিল, যা তিনি পূর্ণ করেছেন। আর তিনি তো আমার শেখানো বিষয় জানতেন, অথচ অনেক মানুষই জানে না।” {সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৬৭-৬৮}
ইবনু আব্বাস রা., ইমাম মুজাহিদ রহ., কাতাদাহ রহ., কুরতুবী রহ.-সহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর সকল মুফাসসিরই এই আয়াত প্রসঙ্গে বলেন-
ইয়াকুব আ. সন্তানদের ব্যাপারে বদনজরের আশংকা করেছিলেন যে, তাঁর সন্তানদের দেখে লোকদের বদনজর লাগতে পারে। কারণ তাঁরা অনেকগুলো ভাই, আবার প্রত্যেকেই সুস্বাস্থ্যবান ও সুঠাম দেহের অধিকারী। এজন্য সন্তানদের শহরে প্রবেশের সময় আলাদা আলাদাভাবে প্রবেশ করতে বলেছেন। পাশাপাশি এ-ও উল্লেখ করেছেন—এসব (বদনজর এবং এ থেকে থেকে বাঁচার পদ্ধতি) তো আসলে আল্লাহর হুকুমের ওপরই নির্ভরশীল। তাই সবশেষে আল্লাহর ওপর ভরসা ছাড়া উপায় নেই। {এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন: ৫/৯৫ (পূর্ণাঙ্গ এডিশন) দেখা যেতে পারে।}
২। সূরা কাহাফের ঘটনা-
وَلَوْلَا إِذْ دَخَلْتَ جَنَّتَكَ قُلْتَ مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ إِن تَرَنِ أَنَا أَقَلَّ مِنكَ مَلَاً وَلَاً
“তবে যখন তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন কেন 'মা-শা-আল্লাহ, লা-কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' বললে না!” {সূরা কাহফ, আয়াত: ৩৯}
এটি দুর্বল দলিল, তবুও উল্লেখ্য-এই আয়াতকে একদল আলিম এ কথার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন যে, কোনো কিছু দেখে মুগ্ধ হলে সাথে সাথে মাশা-আল্লাহ, সুবহানাল্লাহ অথবা আলহামদুলিল্লাহ্ বলা উচিত। আলোচ্য আয়াতে উল্লিখিত ব্যক্তি যদি নিজের বাগান দেখে মুগ্ধ হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করত, আল্লাহকে স্মরণ করত তাহলে তার বাগান হয়তো আর নষ্ট হতো না।
এ ব্যাপারে একটি হাদীস উল্লেখযোগ্য-আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরকম বলেছেন, 'কোনো পছন্দনীয় বস্তু দেখার পর যদি কেউ বলে-
مَا شَاءَ اللَّهُ لَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
"আল্লাহ যেমন চেয়েছেন (তেমনই হয়েছে), আল্লাহ ছাড়া কারও ক্ষমতা নেই।"
তাহলে কোনো বস্তু (যেমন: বদনজর প্রভৃতি) সেটার ক্ষতি করতে পারবে না।' {আল-মুজামুল আওসাত: ৪২৭৩, মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ১৭১৫১। সনদ যয়ীফ।}
তবে আলোচ্য আয়াত থেকে এটা বোঝা যায় যে, নিজের নজর নিজের ওপরও লাগতে পারে, একইভাবে নিজের সম্পদ বা সন্তানদের ওপরও লাগতে পারে।
৩। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘটনা
وَإِن يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنٌ
"..কাফিররা যখন কুরআন শোনে তখন (এমনভাবে তাকায়,) যেন তারা তাদের দৃষ্টি দ্বারা আপনাকে আছাড় দিয়ে ফেলে দেবে এবং তারা বলে, সে তো একজন পাগল।” {সূরা কালাম, আয়াত: ৫১}
এ আয়াত প্রসঙ্গে মুফাসসিররা বলেন, এক লোক বদনজরের কারণে প্রসিদ্ধ ছিল। (আমাদের ভাষায় বললে, লোকটার নজর খারাপ ছিল।) মক্কার কাফিররা ওই লোকটাকে কোত্থেকে নিয়ে এসেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন পড়তে বসলে ওই লোকটা নজর দেওয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হেফাজত করতেন। শেষে যখন নজর দিতে ব্যর্থ হতো তখন বলত, ধুর, এই লোক পাগল (নাউজুবিল্লাহ)। এজন্য তার কিছু হচ্ছে না। {তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন: ৮/৫৫০}
এই ঘটনাতে আমরা দেখলাম, কিছু লোকের দ্বারা নজর খুব বেশি লাগে, আমাদের ভাষায় যেটাকে বলি, 'লোকটার নজর খারাপ।' আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সাধারণত বদনজর ইচ্ছাকৃত লাগেনা; কোনো কিছু দেখে খুব মুগ্ধ বা ঈর্ষান্বিত হলে আর তখন যিকির না করলে নজর লাগে। কিন্তু জাদুকরদের কিছু আচার-পদ্ধতি আছে, যা দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে নজর দেওয়া যায়। ইবনুল কায়্যিম রহ.-ও এমনটা বলেছেন, সামনের অনুচ্ছেদে যা বিস্তারিতভাবে আসবে। কারও সম্পদ বা ব্যবসার ক্ষতি করতে কাফির জাদুকর সাধারণত এ ধরনের বদনজরের আশ্রয় নেয়। অর্থাৎ জাদুকর বা কবিরাজকে টাকা দেওয়া হয়, আর সে টাকার বিনিময়ে কুনজর দেয়। হয়তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ের ওই লোকটা এরকম কিছু পারত, যে কারণে মক্কার কুরাইশরা তাকে ডেকে এনেছিল। (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)
এ পর্যায়ে আমরা হাদীস থেকে বদনজরের প্রামাণিকতা দেখবো।
বদনজরের প্রামাণিকতা-হাদীসে রাসূল (সাঃ) থেকে
১। বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে আছে-
حَدَّثَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ، عن رسول الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَذَكَرَ أَحَادِيثَ مِنْهَا، وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ وَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَى اللهِ صَلَيْ صَلَّهُ " الْعَيْنُ حَقٌّ "
“আবূ হুরায়রা রা. আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বদনজর সত্য।” {মুসলিম:৪০৬৪}
২। মুসলিম এবং মুসনাদে আহমাদের হাদীস-
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ، عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : الْعَيْنُ حَقٌّ وَلَوْ كَانَ شَيْءٌ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَعُ سَابَقَ الْقَدَرَ سَبَعُهُ وَإِذَا اسْتُغْسِلْتُمْ فَاغْسِلُوا
“আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বদনজর সত্য, ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকত তাহলে অবশ্যই সেটা হতো বদনজর। যদি তোমাদের বদনজরের জন্য গোসল করতে বলা হয় তবে গোসল করো।” {মুসলিম: ৪০৬৫}
৩। আব্দুর রহমান বিন জাবির রাঃ থেকে বর্ণিত,
وَحَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ جَابِرٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ : "جُلَيْ مَنْ مِنْ مَنْ، قَالَ" أُمَّتِي بَعْدَ قَضَاءِ اللَّهِ وَكِتَابِهِ، وَقَدَرِهِ بِالْأَنْفُسِ। ، يَعْنِي بِالْعَيْنِ
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর ফায়সালা ও তাকদীরের পর আমার উম্মতের সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে।” {মুসনাদে আবূ দাউদ ত্বয়ালিসী: ১৮৫৮, সনদ হাসান}
৪। এই বিষয়ে আরেকটি হাদীস
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও। কেননা বদনজর সত্য।” {ইবনু মাজাহ: ৩৫০৮}
৫। অন্য আরেকটি হাদীস রয়েছে মুসনাদে শিহাবে। হাদীসটির সনদ হাসান।
عَنْ جَابِرٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " إِنَّ الْعَيْنَ لَتُدْخِلُ الرَّجُلَ الْقَبْرَ، وَتْلَمْ الْتْجُلَ الْقَبْرَ، وَتْخِلُ الرَّجُلَ الْقِدْرَ
“জাবির রা. এবং আবূ যর গিফারি রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর মানুষকে কবর পর্যন্ত আর উটকে রান্নার পাতিল পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।” {মুসনাদে শিহাব: ৯৯০}
৬। মুসনাদে আহমাদের একটি হাদীস এরকম--
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، - رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا - قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ - : " الْعَيْتُکُتُکُتٌ " الْحَالِقَ
"আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর মানুষকে উঁচু থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।” {{মুসনাদে আহমাদ: ২৪৭৩, মুসতাদরাকে হাকিম: ৭৫৭৩}
৭। জিন এবং মানুষ উভয়ের দ্বারাই বদনজর লাগতে পারে।
যেমন এই হাদীসে বলা হচ্ছে-
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَعَوَّذُ مِنْ الْجَانِ وَعَيْنِ الْإِنْتَ نَتَزَانِ الْمُعَوِّذَتَانِ فَلَمَّا نَزَلَتَا أَخَذَ بِهِمَا وَتَرَكَ مَا سِوَاهُمَا
"আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে জিনের বদনজর এবং মানুষের বদনজর থেকে আশ্রয় চেয়ে দুআ করতেন। এক সময় মুআওউইজাতাইন (সূরা ফালাক এবং সূরা নাস) নাজিল হলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগুলোকে গ্রহণ করলেন এবং অন্য সবকিছু বাদ দিলেন।” {ইবনু মাজাহ : ৩৫১১, তিরমিযী: ২০৫৮}
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে জিনের নজর লাগার বিষয়টি 'বাতাসলাগা' বলে প্রসিদ্ধ।
৮। আরেকটি হাদীস-
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى فِي بَيْتِهَا جَارِيَةً سَفَهٌ سَفَهَا جَارِيَةً فِي فَقَالَ اسْتَرْقُوا لَهَا فَإِنَّ بِهَا النَّظْرَةَ
“উম্মু সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে এক বালিকাকে দেখলেন, যার চেহারায় জিনের বদনজরের চিহ্ন ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এই মেয়ের জন্য রুকইয়াহ (ঝাড়ফুঁক) করো। কারণ, তার বদনজর লেগেছে।” {বুখারী: ৫৪০৭, মুসলিম: ৪০৭৪}
৯। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ের আরেকটি ঘটনা-
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، أَنَّهُ سَمِعٍ أَبَاهُ، يَقُولُ: اغْتَسَلَ أَبِي سَيْفِي سَهُ بِالْخَرَّارِ فَنَزَعَ جُنَّةً كَانَتْ عَلَيْهِ وَعَامِرُ بْنُ رَبِيعَةَ يَنْظُرُ، قَالَ: وَكَانَ سَهْلْ رَجُلًا أَبْيَضَ حَسَنَ الْجِلْدِ، قَالَ : فَقَالَ لَهُ عَامِرُ بْنُ رَبِيعَةَ: مَا رَأَيْتُ جَلَمِ وَلْکَالْ عَذْرَاءَ، قَالَ : فَوُعِكَ سَهْلٌ مَكَانَهُ وَاشْتَدَّ وَعْكُهُ، فَأْتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبِرَ أَنَّ سَهْلًا وُعِكَ، وَأَنَّهُ غَيْرُ رَائِحِ مَعَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، رَأَلَّهُ اللَّهِ، فَأَلَّهُلُهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَخْبَرَهُ سَهْلٌ بِالَّذِي كَانَ مِنْ أَمْرٍ عَامِرٍ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " عَلَامَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ ؟ أَلَّا بَرَّكْتَ الْنّهُ ؟ تَوَضَّأُ لَهُ "، فَتَوَضَّأَ لَهُ عَامِرٌ، فَرَاحَ سَهْلٌ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ
“সাহল ইবনু হুনাইফ রা. কোথাও গোসলের জন্য জামা খুলেছিলেন। তিনি অত্যন্ত সুশ্রী এবং ফর্সা অবয়বের অধিকারী ছিলেন। বদরী সাহাবী আমির ইবনু রবীআ রা. তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এত সুন্দর কাউকে আমি জীবনে কখনো দেখি নি; এমনকি কুমারীর চামড়াও তো এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমির রা. কথাটা বলার পরপরই সাহল সেখানে বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। তাঁর গায়ে জ্বর চলে আসল এবং তিনি জ্বরের প্রচণ্ডতায় ছটফট করতে লাগলেন। অন্য সাহাবীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অবস্থা জানালেন। সংবাদ পেয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে আসলেন। সাহল রা.-কে হঠাৎ করে এমনটা হবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বললেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, 'তোমরা কেন তোমাদের ভাইকে নজর দিয়ে হত্যা করছ? তুমি যখন তাকে দেখলে, তখন বরকতের দুআ করলে না কেন? নিশ্চয় বদনজর সত্য।' (অর্থাৎ দুআ করলে আর নজর লাগতো না) এরপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমির ইবনু রবিআ রা.-কে বললেন, তার জন্য ওযু করো। অনন্তর তিনি ওযু করলেন। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে ওযুর পানি সাহল রা.-এর গায়ে ঢেলে দিলেন। তখন আল্লাহর রহমতে তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।” {মুয়াত্তা মালিক: ১৬৮১}
এই ঘটনা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। আমরা বুঝতে পারি, কারও দ্বারা নজর লেগেছে-এর মানেই সে ব্যক্তিটি খারাপ নয়; বরং ভালো মানুষেরও নজর লাগতে পারে। এখানে আমির ইবনু রাবীআ রা. তো বদরী সাহাবী; আল্লাহ তাআলা যাদের সব পাপ ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরকম মানুষের দ্বারাই যখন নজর লেগেছে তখন অন্যদের থেকে তো লাগতেই পারে।
১০। অনেকের খুব দ্রুত নজর লেগে যায়। এ ব্যাপারেও হাদীস রয়েছে
عن جَابِرِ بْن عَبْدِ اللَّهِ، يَقُولُ : " رَخَّصَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِآلِ حَزْمٍ فِي رُقْيَةِ الْحَقَالِ وَقَالَةِ الْحَيَّةِ بِنْتِ عُمَيْسٍ : " مَا لِي أَرَى أَجْسَامَ بَنِي أَخِي ضَارِعَةً تُصِيبُهُمُ الْحَاجَةُ ؟ ، قَالَتْ : لَا ، وَلَكِنْ الْعَيْنُ تُسْرِعُ إِلَيْهِمْ ، قَالَ : ارقيهم " ، قَالَتْ : فَعَرَضْتُ عَلَيْهِ ، فَقَالَ : "ارقِيهِ "
"জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযম পরিবারকে সাপে কাটার জন্য রুকইয়াহ করার অনুমতি দেন। আর আসমা বিনত উমায়স রা.-কে বললেন, কী ব্যাপার, আমি যে আমার ভাই জাফর (ইবনু আবি তালিব) রা.-এর সন্তানদের রুগ্ন-দুর্বল দেখতে পাচ্ছি! তারা কি কোনো সমস্যায় ভুগছে? আসমা রা. বললেন, না, বরং তাদের দ্রুত নজর লেগে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তাদের জন্য রুকইয়াহ করো। তিনি বললেন, তখন আমি তাঁকে (দুআটি) শোনালাম। তিনি বললেন, (ঠিক আছে) তুমি তাদের রুকইয়াহ করো।” {মুসলিম: ৪০৮২}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে এমন অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে-বদনজর সত্য এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই।
সব মিলিয়ে আশা করছি, বদনজরের প্রতি বিশ্বাসে পাঠকের মনে আর কোনো অস্পষ্টতা নেই। এটা যদিও কোনো মৌলিক আক্বীদার বিষয় নয়; কিন্তু কুরআন-হাদীস এবং ইজমা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত একটা বিষয় অস্বীকার করলে ঈমান যে ক্ষতিগ্রস্ত হবে-তা তো নিশ্চিত।
#ইসলামিক_একাডেমি_এনপি #হে_মুমিনগণ! #ইবনে_মাজাহ #হাদীস_বিশ্ব_নবীর_বাণী #সুনানে_ইবনে_মাজাহ #রিয়াদুস_সালেহীন #মুহাম্মদের_বাণী

0 Comments