Ticker

10/recent/ticker-posts/

ওয়াজ-নসীহত করা ও তাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা।

ওয়াজ-নসীহত করা ও তাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা।

ইসলামে ওয়াজ-নসীহত বা দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আম্বিয়া-কেরাম ও রাসুলগণের কাজ। তবে এই মহৎ কাজটি করার ক্ষেত্রে ‘মধ্যম পন্থা’ বা ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য এবং নির্দেশ।
নিচে ওয়াজ-নসীহতে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের গুরুত্ব এবং পদ্ধতি সম্পর্কে :

১. ওয়াজ-নসীহতে মধ্যম পন্থা কী?
মধ্যম পন্থা হলো—বাড়াবাড়ি (ইফরাত) এবং ছাড়াছাড়ি (তাফরিত)-এর মাঝখানের পথ। ওয়াজের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো:
খুব বেশি দীর্ঘ সময় নিয়ে আলোচনা না করা, যাতে শ্রোতারা বিরক্ত হয়।
আবার এত কম বলা নয় যাতে মূল বার্তা অস্পষ্ট থাকে।
কঠোর ভাষা ব্যবহার না করে নম্রতা ও প্রজ্ঞার সাথে কথা বলা।

২. কুরআন ও হাদিসের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা কুরআনে দাওয়াত ও নসীহতের মূলনীতি বলে দিয়েছেন:
“আপনি আপনার রবের পথে মানুষকে ডাকুন প্রজ্ঞা (হিকমত) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়।” (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
রাসূলুল্লাহ (সা.) ওয়াজের ক্ষেত্রে সর্বদা শ্রোতাদের মানসিক অবস্থার খেয়াল রাখতেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন:
“নবী করীম (সা.) আমাদের উপদেশ প্রদানের জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করে নিতেন, যাতে আমরা বিরক্ত হয়ে না যাই।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

৩. ওয়াজ-নসীহতে ভারসাম্য বজায় রাখার উপায়
ক) সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা:
দীর্ঘ সময় ধরে ওয়াজ করা সুন্নাহর পরিপন্থী। রাসূল (সা.)-এর খুতবা বা নসীহত হতো সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত সারগর্ভ। দীর্ঘ আলোচনায় শ্রোতার মনোযোগ নষ্ট হয় এবং বিরক্তি সৃষ্টি হয়।

খ) ভয় ও আশার ভারসাম্য:
নসীহতে শুধুমাত্র জাহান্নামের ভয় দেখিয়ে মানুষকে নিরাশ করা যাবে না, আবার শুধু জান্নাতের কথা বলে আমলহীন করা যাবে না। জান্নাত ও জাহান্নাম, ভয় (খাওফ) ও আশা (রজা)—উভয়ের সংমিশ্রণে আলোচনা করা উচিত।

গ) ভাষা ও আচরণের নম্রতা:
চিৎকার-চেঁচামেচি বা কর্কশ ভাষায় কথা বলা ইসলামের রীতি নয়। আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের মতো অত্যাচারীর কাছে পাঠানোর সময়ও বলেছিলেন, “তার সাথে নরম কথা বলবে।” (সূরা ত্ব-হা: 
৪৪)। সুতরাং শ্রোতাদের গালিগালাজ বা আক্রমণাত্মক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।

ঘ) সত্য ও সঠিক তথ্যের উপস্থাপন:
জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য বানোয়াট গল্প, জাল হাদিস বা ভিত্তিহীন কিচ্ছা-কাহিনী বলা যাবে না। শুধুমাত্র কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে কথা বলতে হবে। এটিই মধ্যম পন্থা ও সিরাতুল মুস্তাকিম।

ঙ) ব্যক্তি আক্রমণ পরিহার:
ওয়াজের মঞ্চ কোনো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার স্থান নয়। এখানে সামগ্রিক সংশোধনের কথা বলতে হবে, কারো নাম ধরে বিষোদগার করা ইসলাম সমর্থন করে না।

৪. শ্রোতাদের অবস্থা বোঝা
শ্রোতারা যদি সাধারণ মানুষ হন, তবে তাদের সামনে খুব কঠিন তাত্ত্বিক আলোচনা করা ঠিক নয়। আবার শিক্ষিত সমাজে অবৈজ্ঞানিক বা অযৌক্তিক কথা বলাও ঠিক নয়। স্থান-কাল-পাত্র বুঝে কথা বলাই হলো ‘হিকমত’ বা প্রজ্ঞা।
উপসংহার
ওয়াজ-নসীহত হলো মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলার মাধ্যম। এটি কোনো বিনোদন বা ব্যবসার মাধ্যম নয়। তাই বক্তা ও শ্রোতা উভয়কেই বাড়াবাড়ি পরিহার করে রাসূল (সা.)-এর দেখানো মধ্যম ও সুন্দর পথ অনুসরণ করা উচিত। এতেই সমাজের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত।

Post a Comment

0 Comments