ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে কেবল ইবাদতগাহে আবদ্ধ থাকতে বলে না; বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সাথে উত্তম সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। muhammadswords-এর আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব জনসাধারণের সাথে মেলামেশা, উত্তম সভা-সমিতিতে যোগদান, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া এবং জানাযায় শরিক হওয়ার গুরুত্ব ও ফযিলত নিয়ে।
মানুষ সামাজিক জীব। একাকী বসবাস করা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি নয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সর্বদা সাহাবীদের সাথে থাকতেন, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়াতেন এবং সামাজিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।
১. জনসাধারণের সাথে মেলামেশা ও ধৈর্য ধারণ করা
অনেক সময় মনে হতে পারে, মানুষের সাথে মিশলে নানা ধরনের কথা শুনতে হয় বা কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়, তাই একাকী থাকাই শ্রেয়। কিন্তু ইসলাম এই ধারণা সমর্থন করে না (ফিতনার সময় ব্যতীত)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"যে মুমিন মানুষের সাথে মেলামেশা করে এবং তাদের পক্ষ থেকে আসা কষ্ট বা যাতনায় ধৈর্য ধারণ করে, সে ওই মুমিনের চেয়ে উত্তম, যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে না এবং তাদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৩২, তিরমিজী)
জনসাধারণের সাথে মেলামেশার মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া সহজ হয়, মানুষের ভুল শুধরে দেওয়া যায় এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় হয়। তবে এই মেলামেশা অবশ্যই গুনাহমুক্ত এবং শরিয়তসম্মত হতে হবে।
২. উত্তম সভা-সমিতি ও বৈঠকে যোগদান করা
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যেখানেই যাবেন, সেখান থেকে কল্যাণ আহরণ করবেন। ইসলামে 'উত্তম বৈঠক' বলতে বোঝায় যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আলোচনা হয়, জ্ঞান চর্চা হয় অথবা মানুষের উপকারের জন্য পরামর্শ করা হয়।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন:
"তাদের অধিকাংশ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই, তবে (কল্যাণ আছে) যে নির্দেশ দেয় দান-খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের।" (সূরা নিসা: ১১৪)
ভালো মজলিসে বা দ্বীনি আলোচনায় বসার ফযিলত অপরিসীম। হাদিসে এসেছে, যখন কোনো দল আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য একত্রিত হয়, তখন ফেরেশতারা তাদের ঘিরে রাখেন, রহমত তাদের ঢেকে নেয় এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের কথা ফেরেশতাদের কাছে গর্বভরে উল্লেখ করেন।
তাই অযথা আড্ডা বা গীবতের আসর বর্জন করে, জনকল্যাণমূলক এবং দ্বীনি সভা-সমিতিতে উপস্থিত হওয়া প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য।
৩. রোগীকে দেখতে যাওয়া (Iyadat-ul-Mareed)
ইসলামে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হলো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া। এটি এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের হক বা অধিকার।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করো (দেখতে যাও) এবং বন্দিকে মুক্ত করো।" (সহিহ বুখারি)
রোগী দেখার ফযিলত:
হযরত আলী (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি:
"যে ব্যক্তি সকালবেলা কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায়, সত্তর হাজার ফেরেশতা বিকেল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর বিকেলে দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। এবং তার জন্য জান্নাতে একটি ফলের বাগান তৈরি হয়।" (সুনানে তিরমিজী: ৯৬৯)
রোগী দেখার কিছু আদব:
রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা (যদি না সে পছন্দ করে)।
রোগীকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং তার জন্য দোয়া করা।
রোগীর সামনে নেতিবাচক কথা না বলা।
৪. জানাযায় শরীক হওয়া
মৃত্যু এক অবধারিত সত্য। কোনো মুসলমান মারা গেলে তার জানাযায় অংশগ্রহণ করা জীবিতদের ওপর একটি সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি শেষ সম্মান এবং জীবিতদের জন্য মৃত্যুর স্মরণ।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন:
"যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় কোনো মুসলমানের জানাযায় অনুগমন করে এবং তার জানাযার নামাজ আদায় ও দাফন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সাথে থাকে, সে দুই কিরাত সওয়াব নিয়ে ফিরবে। প্রতিটি কিরাত ওহুদ পাহাড়ের সমতুল্য।" (সহিহ বুখারি: ৪৭)
জানাযায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায়, যা সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে।
#রিয়াদুস_সালেহীন দ্বিতীয় খণ্ড অনুচ্ছেদঃ৭০
উপসংহার
ইসলাম বৈরাগ্য বা সন্ন্যাসবাদ শিক্ষা দেয় না। বরং সমাজের মানুষের সাথে মিলেমিশে থেকে, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের কাজ।
আসুন, আমরা আমাদের চারপাশের মানুষের হক আদায় করি, অসুস্থদের সেবা করি এবং একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ মোতাবেক জীবন যাপন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
#islamic_academy_NP #Islam #Akhlaq #Humility #MuslimBrotherhood #IslamicAcademyNP #BanglaIslamicBlog #Sunnah #Hadith
.jpg)
0 Comments