Ticker

10/recent/ticker-posts/

দৃষ্টির পবিত্রতা ও অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানোর ভয়াবহতা: একটি ইসলামী বিশ্লেষণ

ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত চরিত্র, লজ্জা এবং সম্ভ্রম রক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মুমিনের অন্যতম গুণ হলো ‘হায়া’ বা লজ্জাশীলতা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “লজ্জা ঈমানের অঙ্গ।” এই লজ্জাশীলতার একটি প্রধান দিক হলো নিজের সতর (লজ্জাস্থান) ঢেকে রাখা এবং অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা। আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব, অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো প্রসঙ্গে ইসলাম কী কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।

দৃষ্টির পবিত্রতা ও অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানোর ভয়াবহতা


সতর বা লজ্জাস্থান কী?
ইসলামী শরিয়তে পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং নারীদের জন্য (মাহরামদের সামনে ছাড়া) পুরো শরীর ঢেকে রাখা ফরজ। একেই ‘সতর’ বলা হয়। নিজের সতর ঢেকে রাখা যেমন ফরজ, তেমনি অন্যের সতরের দিকে তাকানোও হারাম বা নিষিদ্ধ।


কুরআন মাজীদের নির্দেশনা:
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন।” (সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩০)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, চোখের পবিত্রতা রক্ষা করা অন্তরের পবিত্রতার পূর্বশর্ত।


হাদীস শরীফে কঠোর নিষেধাজ্ঞা:
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানোকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এ বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস নিচে উল্লেখ করা হলো:


১. স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা:
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
“কোনো পুরুষ অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না এবং কোনো নারী অপর নারীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না।”
(সহীহ মুসলিম: ৩৩৮: সুনান ইবনে মাজহা ১৩৭)


২. অভিশাপ বর্ষণ:
যিনি লজ্জাস্থান দেখেন এবং যিনি দেখান—উভয়ের ওপরই লানত বর্ষিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে:
“আল্লাহর লানত (অভিশাপ) বর্ষিত হোক ঐ ব্যক্তির ওপর যে (অন্যের) লজ্জাস্থানের দিকে তাকায় এবং ঐ ব্যক্তির ওপর যে নিজ লজ্জাস্থান (অন্যকে) দেখায়।”
(বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ৭৩৯৯)

দৃষ্টির পবিত্রতা ও অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানোর ভয়াবহতা:


৩. আকস্মিক দৃষ্টি:
অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো লজ্জাস্থানের ওপর দৃষ্টি পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে বলেন:
“হে আলী! একবার (অনিচ্ছাকৃত) দৃষ্টি পড়ার পর দ্বিতীয়বার তাকাবে না। কারণ প্রথম দৃষ্টিটি তোমার (ক্ষমাযোগ্য), কিন্তু দ্বিতীয়টি তোমার নয় (বরং গুনাহ)।”
(আবু দাউদ, তিরমিজি  সুনান ইবনে মাজহা )


চিকিৎসা বা জরুরি প্রয়োজনে হুকুম:
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। সাধারণ অবস্থায় অন্যের লজ্জাস্থান দেখা হারাম হলেও, জীবন বাঁচানো বা চিকিৎসার প্রয়োজনে ডাক্তারের জন্য রোগীর লজ্জাস্থান দেখার অনুমতি রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো—ততটুকু স্থানই দেখা যাবে যতটুকু চিকিৎসার জন্য একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত দেখা বা স্পর্শ করা জায়েজ নয়।


আধুনিক প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়:
বর্তমান যুগে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অশ্লীলতা এবং অন্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা খুব সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্নোগ্রাফি বা অশ্লীল ভিডিওর মাধ্যমে অন্যের লজ্জাস্থান দেখা জঘন্যতম গুনাহ এবং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। এটি মুমিনের ঈমানি নূর কেড়ে নেয় এবং অন্তরকে মৃত করে দেয়।


আমাদের করণীয়:
১. নিজের সতর সর্বদা ঢেকে রাখা।
২. অন্যের সতর বা লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো থেকে দৃষ্টিকে কঠোরভাবে হেফাজত করা।
৩. পাবলিক টয়লেট, ড্রেসিং রুম বা গোসলখানায় সতর্ক থাকা।
৪. নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা ছড়ায় এমন সব মাধ্যম থেকে দূরে থাকা।


উপসংহার:
দৃষ্টির পবিত্রতা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য দান করে। অপরের লজ্জাস্থানের দিকে তাকানো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই নিষিদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের সম্ভ্রম ও সামাজিক শিষ্টাচারেরও পরিপন্থী। আসুন, আমরা আমাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ)-এর নির্দেশ মেনে চলি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে চোখের গুনাহ এবং অশ্লীলতা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।


#IslamicAcademyNP #MuslimUmmah #Sins #HalalLife #BengaliIslamicPost #সতর #লজ্জাস্থান #চোখের_হেফাজত #Islam #Satr #Modesty #IslamicPost #Hadith #Quran #EyesProtection #Haya

Post a Comment

0 Comments