Ticker

10/recent/ticker-posts/

ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে পানাহার ও মেলামেশা: কুরআন ও সহীহ হাদিসের আলোকে স্পষ্ট বিধান

ঋতুস্থাবস্থায় স্ত্রীর সাথে একসাথে খাওয়া বা মেলামেশা কি জায়েজ? ইসলাম একাডেমি এনপি ব্লকে জানুন সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসের আলোকে সঠিক বিধান এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ।

অনেক মুসলিম পরিবারে ঋতুস্থাবস্থা নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত আছে। বিশেষ করে, ঋতুবতী অবস্থায় স্ত্রীর সাথে একই থালা থেকে খাওয়া, একই বিছানায় শোয়া বা স্বাভাবিক মেলামেশা নিয়ে মানুষের মনে সংশয় ও প্রশ্ন জাগে। ইসলাম একাডেমি এনপি ব্লকের আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কুরআন ও "সহীহ হাদিসের" আলোকে ‘ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে পানাহার ও মেলামেশা’ বিষয়টির সঠিক ইসলামী বিধান তুলে ধরব, যাতে আপনার মনের সকল সংশয় দূর হয়।

কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা আল-বাকারায় (আয়াত ২২২) ঋতুস্থাবস্থার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন:

"আর তারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলো, এটি একটি কষ্টদায়ক বিষয়। অতএব, ঋতুস্রাবের সময় স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকো এবং তাদের নিকটবর্তী হয়ো না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়..."


এখানে 'দূরে থাকো' বলতে বুঝানো হয়েছে যৌন মিলন বা সহবাস থেকে বিরত থাকতে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো প্রকার যোগাযোগ বা মেলামেশা বন্ধ হয়ে যাবে।


সহীহ হাদিসের আলোকে পানাহার ও মেলামেশা

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী (সিরাত) এবং সহীহ হাদিসগ্রন্থগুলো থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারি যে, ঋতুস্থাবস্থায় স্ত্রীর সাথে একসাথে বসে খাওয়া-দাওয়া, পানি পান করা এবং স্বাভাবিক মেলামেশা সম্পূর্ণ জায়েজ ও সুন্নাহ সম্মত।



নিচে কিছু সহীহ হাদিসের রেফারেন্স দেওয়া হলো যা এই বিধানকে সুস্পষ্ট করে:


১. একই পাত্র থেকে পানি পান করা:

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

"রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো কিছু খেতে বা পান করতে চাইতেন, তখন আমি ঋতুবতী অবস্থায় থাকলে তিনি সেই পাত্রটি আমার কাছে নিয়ে আসতেন। আমি যে স্থানে আমার মুখ লাগিয়েছিলাম, তিনি সেখানেই তাঁর মুখ লাগিয়ে পান করতেন।"

(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৯৮; সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩০৫)


এই হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, ঋতুবতী স্ত্রীর ব্যবহৃত পাত্র থেকে স্বামীর পানি পান করা বা একই পাত্র ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ।


২. একই বিছানায় শয়ন ও কাপড়ের সংস্পর্শ:

হযরত মাইমুনা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

"রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং আমি ঋতু অবস্থায় থাকাকালীন একই কম্বল বা চাদরের নিচে শুতাম।"

(সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩০১; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৯৯)

অন্য একটি বর্ণনায় হযরত আয়েশা (রা.) বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.) ঋতু অবস্থায় আমার সাথে একই

বিছানায় শয়ন করতেন, তবে আমাদের মাঝখানে কাপড়ের ব্যবধান থাকত।"

(সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ৩০২)


৩. স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে বিশ্রাম নেওয়া:

হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন:

"রাসূলুল্লাহ (সা.) ঋতু অবস্থায় আমার কোলে মাথা রেখে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।"

(সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৯৭)


সাধারণ কিছু ভুল ধারণা ও তার সমাধান

১. ভুল ধারণা: ঋতুবতী স্ত্রীর ছোঁয়া লাগলে অজু বা গোসল ভেঙে যায়।

   সত্য: উপরের হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত যে, রাসূল (সা.) ঋতুবতী স্ত্রীদের স্পর্শ করতেন এবং তাদের সাথে মেলামেশা করতেন। শরীয়তে ঋতুবতী স্ত্রীর স্পর্শে অজু বা গোসল ভাঙে না।


২. ভুল ধারণা: ঋতুস্থাবস্থায় স্ত্রীর সাথে এক থালা থেকে খাওয়া মাকরুহ বা অনুচিত।

    সত্য: এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং রাসূল (সা.) নিজেই ঋতুবতী স্ত্রীর ব্যবহৃত পাত্র থেকে পানি পান করেছেন, যা এর জায়েজ হওয়ার সবচেয়ে বড় দলিল।



স্বামী-স্ত্রীর প্রতি পরামর্শ

ঋতুস্থাবস্থা একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। এই সময়ে স্ত্রীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল বা অস্বস্তিবোধ করতে পারেন। এমন সময়ে স্বামীর উচিত স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা, তাদের সেবাযত্ন করা এবং সুন্নাহ সম্মত স্বাভাবিক মেলামেশার মাধ্যমে তাদের মানসিক প্রশান্তি দেওয়া। একসাথে পানাহার বা মেলামেশা পারিবারিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে এবং ভালোবাসা বাড়ায়।


অবশ্যই, দুটি উপসংহারের সেরা অংশগুলো একত্রিত করে একটি গোছানো ও শক্তিশালী উপসংহার নিচে দেওয়া হলো:


উপসংহার

ইসলাম কখনোই অকারণ কঠোরতা আরোপ করে না; বরং এটি মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সহজ ও সহনশীলভাবে দেখতে শেখায়। ঋতুস্থাবস্থায় স্ত্রীর সাথে পানাহার ও স্বাভাবিক মেলামেশা জায়েজ হওয়ায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা, আস্থা ও পারিবারিক সম্পর্ক অটুট থাকে। তাই অযৌক্তিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা বর্জন করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবনযাপন করাই হলো প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে শরিয়তের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শরিয়তের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।


#ঋতুবতী_স্ত্রীর_সাথে_পানাহার, #ঋতুস্থাবস্থায়_হাদিস, #সহীহ_বুখারী_হাদিস, #ইসলামে_ঋতুস্থাবস্থার_বিধান, #স্বামী_স্ত্রীর_মেলামেশা, #ইসলামিক_ফিকহ,

Post a Comment

0 Comments